২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় দুশ্চিন্তায় জেলেরা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৭-১০-২০২৬ ১১:১০:০৪ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
০৭-১০-২০২৬ ১১:১০:০৪ পূর্বাহ্ন
ফাইল ছবি
৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে ফিরেও স্বস্তি নেই পটুয়াখালীর জেলেদের। মাছ ধরার মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের কারণে বারবার তীরে ফিরতে হয়েছে তাদের। ফলে কাঙ্ক্ষিত সময় সাগরে থাকতে না পারায় আশানুরূপ মাছও পাননি অনেক জেলে। এর মধ্যেই শুরু হচ্ছে ইলিশের প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এতে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উপকূলের প্রায় ৮৫ হাজার নিবন্ধিত জেলে।
আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা, বিক্রি, পরিবহন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ সময়ে আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় পরিবারের খরচ, ট্রলারের কিস্তি, জাল-দড়ি ও অন্যান্য ব্যয় কীভাবে মেটাবেন, তা নিয়ে চিন্তিত জেলেরা।
জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার যে সহায়তার চাল দেয়, তা যেন নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই তাদের হাতে পৌঁছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে বাড়তি সহযোগিতারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাগর থেকে ফিরে কেউ জাল-দড়ি গুছিয়ে রাখছেন, আবার কেউ ট্রলার প্রস্তুত করছেন। তবে সবার মধ্যেই বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। জেলেদের ভাষ্য, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে অনেক আশা নিয়ে সাগরে ফিরলেও নিম্নচাপ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঠিকমতো মাছ ধরতে পারেননি তারা।
জেলে মামুন হাওলাদার বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবারের খরচ চালাতে সরকারি সহায়তার চাল তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় সেই চাল নিষেধাজ্ঞার শেষের দিকে গিয়ে হাতে আসে। এতে প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার চালটা যদি ঠিক সময়ে দিত, তাও চলত। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরে চাল দিয়ে কী করব?
ট্রলার মাঝি আলামিন বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা ঠিকমতো সাগরে থাকতে পারেননি। এখন সাগরে মাছের উপস্থিতি ভালো থাকলেও নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছ ধরার সুযোগ থাকছে না।
তিনি বলেন, অবরোধ আর আবহাওয়া আমাদের ঠিকভাবে সাগরে থাকতে দিল না। সাগরে এখন মাছ ভালো, কিন্তু মাছ তো আর ধরতে পারব না। নিম্নচাপের কারণে সাগর উত্তাল ছিল। সাগরে গেছি আর আসছি। এখন কীভাবে কিস্তি আর সংসার চালাবো, সেটাই চিন্তা।
জেলেদের কেউ কেউ বলছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে আরও কয়েক দিন মাছ ধরার সুযোগ পেলে কিছুটা স্বস্তি পেতেন তারা। এ কারণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময় কিছুটা পিছিয়ে দেয়ার দাবিও জানিয়েছেন অনেকে।
আলামিন বলেন, সরকার যদি অবরোধটা একটু পিছিয়ে দিত, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো। এখন সাগরে একটু মাছ আছে। এই ২২ দিনের পর সাগরে আর মাছ থাকতেও পারে না। আমাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞাটা যেন একটু পিছিয়ে দেয়া হয়।
তবে ইলিশের প্রজনন ও মাছের উৎপাদন বাড়াতে নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জেলেদের আপত্তি নেই। তাদের প্রধান দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবার চালানোর জন্য সরকারের দেয়া সহায়তা যেন যথাসময়ে ও সঠিকভাবে তাদের কাছে পৌঁছে।
এদিকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা সফল করতে মাঠপর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছে মৎস্য বিভাগ। জেলেদের সচেতন করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে উঠান বৈঠক, গণসংযোগ ও মাইকিং করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে যাতে কোনো জেলে সাগরে না যান, সে বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।
পটুয়াখালীর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, নিষেধাজ্ঞা সফল করতে ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জেলেদের নিয়ে উঠান বৈঠক করা হচ্ছে এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই জেলেদের চাল দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় চালের বরাদ্দও ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীতে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৮৫ হাজার। এসব জেলে ও তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জীবিকা মূলত নদী ও সাগরে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা তাদের জন্য কার্যত আয়-রোজগার বন্ধ থাকার সময়।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার সময়ে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। মাছ ধরার মৌসুমে আয় করে অনেকে নিষেধাজ্ঞার সময়ের খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে পর্যাপ্ত মাছ ধরতে না পারায় সেই সঞ্চয়ও হয়নি। ফলে নতুন করে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
জেলেদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি সহায়তা যথাসময়ে না পৌঁছালে অনেক পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে ট্রলারের কিস্তি, জাল-দড়ি, জ্বালানি ও ধারদেনা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
সাগরে মাছ থাকলেও ৮ অক্টোবর থেকে জাল ফেলতে পারবেন না জেলেরা। নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরের পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তখন পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যাবে কি না- তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। তাই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার পাশাপাশি এই ২২ দিন কীভাবে সংসার চালাবেন, সেই হিসাবই এখন কষছেন পটুয়াখালীর উপকূলের হাজারো জেলে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স